খুব ছোটোবেলা থেকে ভীষণ অলস হাওয়াতে, ঘুমের আমার পরিমানটা ছিলো আর দশের চাইতে বেশ খানিকটা বেশী। খুব খেয়াল করে দেখেছি গত ৯ মাস ২৮ দিনে, ২৪ ঘন্টায় আর যতবার যে সময়ে ঘুম থেকে জেগে উঠি না কেন তার কোনো সঠিক ধারাবাহিকতা দাড়ায় না। তবে গ্রীষ্মের মতো এই এখনকার গভীর শীতেও ঠিক ভোরে ৬টায় চোখ দুটো আর অলস থাকে না, আপনা থেকেই মেলে যায়; ঠিক যেন নির্ভূল এল্যার্ম ঘড়ির দায় পালনে নিবেদিত তারা। একটুও এদিক-ওদিক হয়না গর্ধব প্রহরী দুটোর।
তারপর দিনের ১ম কাজ দেবীর প্রোফাইলে বা কাভারে নতুন একটা ছবি ♥, অথবা পুরোনো ছবিই আবার পরিবর্তন করে ফিরিয়ে আনা হয়েছে কিনা সেই খোঁজ নেয়া। মাঝে মাঝে অনিয়মের ক্লান্তিভূখ শরীরে আধোঘুম মগ্নতায় করা হয় কাজটা। তবু সুবিধের ব্যাপার হলো, এটা করতে ২-৩ মিনিটের বেশী কখনোই লাগেনা। প্রায়শই আবার ঘুমিয়েপড়ি। স্মার্টফোন আসলেই আমার জীবনটা অনেক সহজ করে দিয়েছে, এই সংক্ষিপ্ত কাজটুকু করতে ডেস্কটপ বা ল্যাপটপে আরো বেশী সময় নিতো, বিছানা ছেড়ে উঠতে হতো।
আমার ২য় নিয়মিত কাজটা করা হয় সকাল আনুমানিক সাতটা থেকে শোয়া আটটার মধ্যে। ১ কাপ মোটামুটি উষ্ণ গ্রীনটি পান করা। গ্রীনটি আমি প্রাক্টিক্যালি জীবনে একবারই চেষ্টা করার দুঃসাহস করেছিলাম। তাতে দুটো কষ্টসাধ্য সিপের পরে ৩য় চুমুক এখনো আমার অধরাই আছে। তবে, কল্পনার রাজ্যে গ্রীনটি এর স্বাদ হয়তো ততটা কর্কশ না তাই সহজেই নিয়মিত হতে পেরেছি।
৩য় দ্বায়িত্ব সকাল নয়টা থেকে সোয়া নয়টা বা সর্বোচ্চ সাড়ে নয়টার মধ্যে ব্রাউজারে ফেসবুক খোলা, দিনের ১ম কাজের রিপিট ডিউটি সুসম্পন্ন করা; ঠিক এই সময়টাতেই ফেসবুকে অনলাইন হওয়া তার ডেইলি রুটিন ছিলো কিনা! কোনো পার্থিব যোগাযোগ না থাকায় তার এখনকার রুটিনে নতুন কোনো পরিবর্তন এসেছে কিনা জানা নেই। তবে প্রকৃতির হিসেব মতে তাকে যতটুকু চিনেছি, ধারণ করেছি – তার তো পূর্বের রুটিনেই থাকার কথা।
উল্ল্যেখ্য, দিনে গড়ে অন্তত ৮-১০ বার আমি নিজের নোটিফিকেশনস গুলো চেক করি। কয়েকদিন পর পর ১-২ টা স্ট্যাটাসও লিখে রাখি পরবর্তী বাঁচার সম্ভাব্য বছর গুলোর স্মৃতিচারন উপাকরনের দৈন্যতা ঘোচানোর উদ্দ্যেশ্যে।
সূর্য্য সাক্ষীতে অর্থাৎ দিনের আলোতে সিরিয়াসলি মেইন্টেইন করার মতো (ভেরী রেগুলার) আর তেমন কোনো কাজ নেই। নিয়মিত না হলেও মাঝে মাঝে, বেলা একটা থেকে দুটোর মধ্যে রান্নাঘরে একবার উঁকি দেই। কেন উঁকি দেই বা কিছু খুঁজি কিনা নিজেও জানিনা। তবে এই সময়টাতে নারীজাতির মধ্যে যারা রেগুলার রান্নার কাজটা করেন; বিশেষ করে যারা বটিতে পেয়াজ, কাচা-মরিচ বা আলু কুচি কাটেন, তাদের বুড়ো আংগুলের চুলচেরা কাটাদাগ গুলো মনে পড়ে। মন্দির থেকে রিক্সাচেপে বাড়ি পৌঁছে দেবার সময়ে (২০১৯ এপ্রিলের এক শুক্রবার ঠিক মধ্য দুপুরে, এপ্রক্সিমেটলি একটা থেকে দেড়টা) ধানমণ্ডি রাইফেলস স্কুল অ্যান্ড কলেজ মোড়ে দেবীর আংগুলে ঐ ক্ষত কোনো এক আজন্ম পাপের ফল স্বরূপ আমার চোখে পড়েছিলো। আমি কখনই রান্নাঘরের কাজ করিনা তবু ৩ বেলা খেয়েই চলেছি। তাই ঐ দাগের নিষ্ঠুরতম ঋণ আমায় অপরাধী করে খুব বাজেভাবে ভেতরটা রক্তাক্ত করে দেয়। সাউথ এশিয়া বা আরো নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে ইন্ডিয়ান রেজিওনের এই এক পক্ষীয় রান্নাঘরের ডিউটি আসলেই চরম অমানবিক। এই সমস্যাটা আমাদের বিত্তহীন, নিন্মবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত পরিবারে খুবই প্রকট।
রাত ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে ফেসবুকে আরেকটা রুটিন চেক। কারন দুপুরে স্নানের আগে হোক-নাহোক, সকাল আর রাতের ঠিক নির্দিষ্ট সময়েই সে তার ফেসবুক একাউন্টের যত্ন নিতো তো…!
প্রায়ই পুরনো এবং নতুন ২ জীবনের অর্থাৎ দ্বিগুন ঘানি টানার সিডিউল মেইনটেইন করে আমি হাফিয়ে উঠি। তবু আমার উপায় নেই, আমি যে পতিশ্রুতিবদ্ধ! হয়তো নিজেই প্রতীক্ষার যন্ত্রণা সুখ হিসেবে উপভোগ করা শিখে গেছি অথবা শারিরিক-আর্থিক দৈন্যতা এলেও আত্মবিশ্বাসের ভীতটা এখনো নড়বড়ে হয়ে যায়নি।
যাইহোক, বেখেয়ালি আমার নিতান্ত ঠান্ডা সর্দিকাশির কষ্ট উপশমের জন্যে যেভাবে বিচলিত হয়েছিলে…, অধিকারের আবদারে রাত ১০টার পরেও আর্জেন্ট মেডিসিন কিনতে বাধ্য হয়েছিলাম!!! আমার পরিচিত প্রায় সকলেই জানে, অধিকার দেবার বিষয়ে আমি কতটা কৃপণ। আজন্ম অতটা অধিকার তুমি ভিন্ন কাউকেই দেইনি আমি। এমনকি পরিবার, বন্ধু, আত্মীয়দেরও নয়। ঠান্ডা-সর্দিকাশির মত আরো কতোশত উপলক্ষ্য যে আছে দেবীর কথা ভেরি ফ্রিকোয়েন্টলি মনে করিয়ে দেবার… সব লেখা যাবে না, এমনিতেই হ্যাংলা বলে মানুষ তাচ্ছিল্য করে, ওদের হয়তো আমার জন্যে করুণা বা মায়া হয়। তাই হয়তো অপমানের মাধ্যমে আমায় গতিহীন করতে চায়। ওরা তো জানে না, প্রকৃতি আমার নিয়মিত উৎসাহ যোগায় বাঁচার ও বাঁচানোর। আমি দেখেছি, জেনেছি, বুঝেছি, শিখেছি, বিশ্বাসে উপলব্ধি করেছি, “মরার আগে মেরে ফেলতে নেই” So, I can’t give-up! হত্যা/আত্মহত্যার মতো পরাজয় পাপ আর ২য়টি হয়না…
Photo: Pablo Heimplatz